ইসলাম গবেষণা ও কিছু কথা
(সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ ॥ হাক্কানী মিশন, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬, ৬ জুন ২০০৪ প্রকাশিত হয়েছিল)।
অখণ্ড অদ্বিতীয় সয়ম্ভূ আল্লাহ্কে আহাদ আল্লাহ বলা হয়। এই আহাদ আল্লাহর বিষয়টি তুলে না ধরে এক তথা ওয়াহেদ আল্লাহর কথাটি বলতে
গেলেই যুক্তি আর তর্কের সামনে অনেকেই টিকতে পারেন না। পৃথিবীর বিখ্যাত দার্শনিকেরা পর্যন্ত অনেক সময় নাস্তিকদের যুক্তি-তর্কের কাছে
টিকতে পারছেন না। অথচ আহাদ আল্লাহর বিষয়টি তুলে ধরলে নাস্তিকদের জনক পর্যন্ত বোকা বনে শিয়ালের গর্তে পালাতে বাধ্য। পৃথিবীতে
এমন কোনো নাস্তিক জন্মগ্রহণ করেন নি যে আহাদ আল্লাহর বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরার পর আর একটি কথা বলতে পারবে। কারণ আহাদ
আল্লাহ বলতে বুঝায় যে, কোনো অস্তিত্বই নাই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। ‘পূর্ব এবং পশ্চিমের যে দিকেই তাকাও না কেন আল্লাহ ছাড়া কিছুই নাই'
কোরান-এর এই বাণীটি বোঝাতে চেয়েছে যে, আল্লাহর সিফাত তথা গুণাবলি যদিও জাত তথা মূল বিষয়টি নয়, তবে জাত তথা মূল বিষয়টি না
থাকলে সিফাত তথা গুণাবলির চিন্তাই করা যায় না। কিন্তু পরক্ষণে ‘আমরা তোমার শাহারগের নিকটেই আছি' বলার মাঝে সিফাতটিকে মোটেই
বুঝানো হয় নি। আমরা শাহারগের নিকটেই আছি বলার মাঝে রুহ তথা পরমাত্না কথাটি বোঝানো হয়েছে। তবে এই রুহ তথা পরমাত্নাটি এতই
ক্ষুদ্র আকারে আছে যে ধরা পড়ার কথা নয়। এ জন্যই আল্লাহ্কে হেকমতওয়ালাও বলা হয়। মানব দেহের মাঝে রুহ তথা পরমাত্না আছে বলেই
মোরাকাবার ধ্যানসাধনার মাধ্যমে জাগিয়ে তোলার বার বার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ জন্যই মহানবি তাঁর উম্মতদের শিক্ষা দেবার জন্য হেরা
পর্বতের গুহায় পনের বছর এক মাস উনিশ দিন (সময়ে ও অসময়ে ॥ একটানা নয়) ধ্যানসাধনা করেছেন। ধ্যানসাধনার মোরাকাবাটি বাদ দিলে
ধর্মের একবস্তা ভালো ভালো কথা শেখা যায় এবং সমাজে বিরাট (?) ইসলাম-গবেষক হওয়া যায়, কিন্তু আল্লাহর ওলি হওয়া যায় না। ভালো
ভালো কথা শিখে মানুষকে বোকা বানানো যায়, প্রবন্ধ লিখে চমক তৈরি করা যায়, সাময়িক জিতবার সাময়িক আনন্দ পাওয়া যায়, কিন্তু
আখেরাতটি যে ঝরঝরা, আখেরাতটি যে অন্ধকারে ডুবে থাকে সেটা মরার আগে বুঝবার আর কোনো উপায় থাকে না। সূরা কাহাফটি বার বার
পড়ে দেখুন, দেখতে পাবেন এই কথাগুলো কত নির্মম সত্য। হজরত বু আলি শাহ্ কলন্দরের দেওয়া মোরাকাবাটি তিনবার তিনটি স্থানে করে
দেখুন, দেখতে পাবেন সত্যের সামান্য নিদর্শন এবং তা অবশ্যই দেখতে পাবেন বলে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। (অধম লেখকের রচিত সুফিবাদ
আÍপরিচয়ের একমাত্র পথ নামক বইটির প্রথম খণ্ডে হজরত বু-আলি শাহ্ কলন্দরের মোরাকাবাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে)। এই জাতীয়
মোরাকাবাটির মতো না হলেও তবলিগ জামাতের শ্রদ্ধেয় ভাইয়েরা চিল্লা বলেন। এই চিল্লার ধরন-ধারন যাই থাকুক না কেন, কিন্তু এটা তো অপ্রিয়
সত্য যে, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর আল্লাহর নামে ঘরসংসার ছেড়ে চিল্লায় বেরিয়ে পড়েন। সুফিবাদের কিছুটা গন্ধ যে তবলিগ
জামাতের মধ্যে পাওয়া যায় সেটা কিভাবে অস্বীকার করি? সুতরাং তবলিগ জামাতের মৃত্যু হতে পারে না, বরং দিনে দিনেই এর প্রসার ঘটতে
বাধ্য। কারণ আজকের দিনে পীর-ফকিরেরা মোরাকাবার বিষয়টি ঠিক মতো তুলে ধরেন না। কেবল পীরের বাড়িতে আসা-যাওয়া আর কিছু কথা
শেখানো হয় যার দ্বারা অন্যকে জব্দ করা যায়। আর সৌদি আরবের ওহাবিরা তো একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কিছুই মানেন না। যেমন খারেজিরা
এই একই পুরাতন কথাটি বলতো এবং সৌদি আরবে লেখাপড়া শিখে কত সুন্নিদের ছেলেমেয়েরা খাঁটি ওহাবিতে পরিণত হয়েছেন তা বেসরকারি
টেলিভিশনের চ্যানেলগুলোতে সুন্নি লেবাসে ওহাবি মতবাদ হরহামেশা প্রচার থেকেই দেখা যায়। সাধারণ মানুষ তো আর সুন্নি এবং ওহাবির
পার্থক্য জানেন না। সৌদি ওহাবি তো পীর-ফকির আর ওরসকে শেরেক-বেদাত বলে জানেন। এমনকি মহানবি এলমে গায়েব মোটেই জানেন না
বলে দেদার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এই ওহাবিদের কথাগুলো যে কী মারাÍক রিঅ্যাকশন করতে শুরু করেছে তা অনেকেই জানেন না। একটি
নমুনা তুলে ধরছি।
তাসখন্দে খ্রিস্টান পাদ্রিরা ধর্মীয় জলসার মধ্যে বলেছেন যে, আমাদের মহানবি এল্মে গায়েব জানতেন না। সৌদি আরবের বড় বড় ওহাবি
আলেম-উলামাদের দলিলগুলো তুলে ধরার পর পাদ্রিরা কোরান হতে এলমে গায়েব জানার দলিলটি যে যিশু খ্রিস্টের বেলায় বলা হয়েছে উহা আম
জনতার সামনে যুক্তি-ব্যাখ্যা দিয়ে তুলে ধরার পর অনেক মুসলমান অবশেষে খ্রিস্টান ধর্মে চলে গেছেন। এ রকম ন্যাক্কারজনক ঘটনাগুলো যে
অহরহ ঘটে চলেছে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তা বাংলাদেশেরই সুন্নি মাওলানাদের ওয়াজের ক্যাসেট শুনলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। তা ছাড়া সুন্নিদের
প্রচারটি ওহাবিদের বিশাল বিত্ত-বৈভবের প্রচারটির সঙ্গে তুলনাই চলে না।
আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টি (আমার জানা মতে) তৌহিদে বাস করেন এবং তসবিহ্ পাঠ করেন। অবশ্য এই তসবিহ্ পাঠটি আমাদের হাতে বানানো
দানাওয়ালা তসবিহ্ পাঠ নয়। আমাদের দানাওয়ালা তসবিহ্ পাঠের মধ্যে আসল আর ভেজাল দু'টোই পাওয়া যায়। (মীর জাফর দানাওয়ালা
তসবিহ্ পাঠ করতো। কিন্তু কোরান-এর সূরা ইয়াসিনের উপর হাত রেখে বেঈমানি করার দরুণ আমাদেরকে দুইশত বছর ব্রিটিশের গোলামি
খাটতে হলো)। তাই আবার বলছি যে, কোরান-এ যে সমগ্র সৃষ্টিরাজ্য আল্লাহর তসবিহ্ পাঠ করছে বলা হয়েছে সেই তসবিহ্টি দানাওয়ালা তসবিহ্
নয়। আবার আল্লাহর সমস্ত জীব কেবলমাত্র নফ্সের অধিকারী তথা জীবাত্না অধিকারী। জীবাত্না আল্লাহর সিফাত, জাত নয়। সেই জীবাত্নার
প্রকারভেদ থাকতে পারে এবং অবশ্যই প্রকারভেদ আছে কিন্তু রুহ তথা পরমাত্নাটি আল্লাহর জাত, সিফাত নয়। পরমাত্নাটি একমাত্র জিন এবং
মানুষকে দেওয়া হয়েছে। তাই পবিত্র কোরান-এ রুহ তথা পরমাত্নার কথাটি মাত্র সতেরবার উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ফেরেশতাদেরকেও
পরমাত্না তথা রুহ দেওয়া হয় নি। যদিও ফেরেশতা জিবরাইলকে অনেকেই রুহুল আমিন বলে থাকেন, কিন্তু জিবরাইল নামক ফেরেশতাকে রুহ
তথা পরমাত্নাটি দেওয়া হয় নি। অনেকটা কানা ছেলের পদ্মলোচন নাম ধারণ করার মতো। এখানেও অনেক ইসলাম-গবেষক ভুল করে বসেন
এবং লেজে-গোবরের অবস্থাটি দেখতে হয় এবং পাঠকদের পাতে পচা খাদ্য পরিবেশন করতে বাধ্য হয়। পাঠক এই জাতীয় পচা খাদ্য খেয়ে
গোলকধাঁধা নামক ফেরকাবাজির রোগে ভুগতে বাধ্য হয়। আবার আরও মজার বিষয়টি হলো, এই ফেরেশতারাই রসুলরূপে আগমন করেন, যদিও
রুহ তথা পরমাত্নাটি ফেরেশতাদের দেওয়া হয় নাই। পরমাত্না তথা রুহ ফেরেশতাদের যদিও দেওয়া হয় নি, কিন্তু রসুল। তা হলে দেখতে পাচ্ছি
যে, ফেরেশতাদের থেকে আল্লাহ্ রসুল মনোনীত করেন, যদিও রুহ দেওয়া হয় নি (সূরা ফাতিরের এক নম্বর আয়াতটি পড়ে দেখুন), অথচ আরও
অবাক হবেন যে, নবি বানানোর প্রশ্নে কোনো ফেরেশতাকে নবি বানানো হয়েছে এ রকম একটি আয়াত সমগ্র কোরান-এ নেই। আমাদের কপাল
এতই খারাপ যে, বিরাট (?) বিরাট (?) ইসলাম-গবেষণায় রসুলকে নবির চেয়ে বড় করে দেখানো হয়েছে। আর নব্য আরবি ভাষা জাননেওয়ালা
ইসলাম-গবেষকরা কোনো কিছু গবেষণা না করেই তিন নম্বর বকরির বাচ্চার মতো লাফালাফি শুরু করে দেয়। আমরাও ভুলে যেতে চাই যে,
ভাষাশিক্ষাটি মোটেই জ্ঞানশিক্ষা নয়, বরং ভাব প্রকাশের একটি নতুন বাহনমাত্র। এর বেশি নয়। আমরা অনেক সময় একটি প্রচলিত নতুন ভাষা
শিক্ষার এমএ ডিগ্রিধারীকে কত বড় জ্ঞানী বলে কত বড় ভুল না করে বসি। ভারতের এক জাঁদরেল প্রধানমন্ত্রী তাঁর মেয়েকে এই শিক্ষাটি বার বার
বুঝিয়ে দিয়েছেন।
কোরান ফেরেশতাদের নবি বলেন নি। কোরান মানুষের মধ্যে হতে নবি নির্বাচন করেছেন। আর রসুল নির্বাচনের বেলায় কোরান মানুষ এবং
ফেরেশতা উভয়ের মধ্যে হতে নির্বাচন করেছেন (সূরা হজের পঁচাত্তর নম্বর আয়াত) মানব সমাজে এই জাতীয় ইসলাম-গবেষকরা পায়খানা-প্রস্রাব
এতো বেশি করে রেখেছে যে, সুইপার তথা মেথর পর্যন্ত এই বিশাল পর্বতপ্রমাণ পায়খানা দেখে পরিষ্কার করার ভয়ে কিছু না জানার ভান করতে
বাধ্য হচ্ছে। আবার অনেক সময় ভগবানকেও এই জাতীয় গবেষকরা ভুত বানাচ্ছে। তবুও নিজেদের দোষটি অকপটে স্বীকার করেন না। এই
জাতীয় গবেষকদের মুখে আছে সক্রেটিসের বাণী আর ভেতরে শয়তানের মতো আদমকে সিজ্দা না দেবার প্রতিজ্ঞা।
চেরাগে জান শরীফ
ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল-সুরেশ্বরী
>>>ডা:বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী রচিত বইসহ সুফি দর্শনের উপর বাংলায় রচিত বইসমুহ নিম্নোক্ত ঠিকানায় পাওয়া যাচ্ছে...........
ঠিকানা:
সুফিবাদ প্রকাশনালয়
প্রযত্নে:বে-ঈমান হোমিও হল
১০৮ নিউ এলিফ্যান্ট রোড(২য় তলা) ঢাকা-১২০৫
মোবাইলঃ ০১৭১৭৬৩৬৩৫৩

Comments
Post a Comment
JOY GURU.
Thank you for your valuable comment.