কোরান-এ সালাতের উল্লেখ : ৬
কোরান-এর ২ নম্বর সুরা বাকারার ১২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে এবং যখন আমরা ঘরটিকে (কাবাকে) মানুষদের জন্য ঘাঁটি (মিলনকেন্দ্র) এবং নিরাপত্তার স্থানরূপে নির্বাচন করিলাম (ওয়া ইজ জাআলনাল বাইতা মাসাবাতান লিন্নাসে ওয়া আমনান) এবং মাকামে ইব্রাহিমকে মুসাল্লা (সালাতের স্থান) রূপে গ্রহণ করিতে বলিলাম (ওয়াত্তাখেজু মিন মাকামে ইব্রাহিমা মুসাল্লা) এবং আমরা ইব্রাহিম এবং ইসমাইল হইতে তওয়াফকারী এবং এতেকাফকারী এবং রুকু সেজদাকারীদের জন্য আমার ঘরটিকে পবিত্র রাখার জন্য অঙ্গীকার গ্রহণ করিলাম (ওয়া আহেদনা ইলা ইব্রাহিমা ওয়া ইসমাঈলা আন তাহহেরা বাইতিয়া লিতায়েফিনা ওয়াল আকেফিনা ওয়ার রুক্কে ইসসুজুদে)।
ব্যাখ্যা
কোরান-এর এই আয়াতটি দিয়ে প্রথমেই একটি বিষয় প্রমাণিত করা যায় যে, দুনিয়ার সমস্ত সাহিত্যকর্ম একত্রিত করলেও এই আয়াতটির ভাষা ও শৈলীর ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। উর্বর মস্তিষ্কের অধিকারীরা এবং দুনিয়ার বৈষয়িক জ্ঞানের অধিকারীরা আমার এইরূপ মন্তব্যে হয়তো মুচকি হেসে যা-তা একটা কিছু বলতে চাইবে এবং এ রকম কিছু একটা যে বলতে চাইবে ইহা বিদ্যাশিক্ষার কর্মফল হতেই অভিজ্ঞতাটি অর্জন করেছি। ভূতের দেশে কিছুদিন বাস করলেই পেত্নীদের চালচলন জ্ঞানবিদ্যার রঙ-ঢঙগুলো পরিষ্কার বোঝা যায়। কেন এতগুলো কথা বললাম? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ থাকতে পারে। আর সেই কারণটিই হলো, কোরান মেজাজি কাবা এবং হাকিকি কাবার সমন্বয়ে যে আয়াতটি নাজেল করেছেন তাকে মেজাজি অর্থেও গ্রহণ করা যায় আবার হাকিকি অর্থেও গ্রহণ করা যায়। তবে এই আয়াতের মূল বিষয়বস্তুটিতে হাকিকি কাবার কথাটিই বলা হয়েছে। কিন্তু মেজাজি কাবার অবস্থানটিকে অস্বীকার করলে কাবার মূর্তরূপটি আর থাকে না। মেজাজি কাবার মূর্তরূপটি আছে বলেই প্রতিবছর মেজাজি হজের বিরাট আয়োজন করা হয়। এখান থেকেই আল্লাহ্র বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হাকিকি কাবার পরিচয়টি যে লুকিয়ে আছে উহা ধরতে পারে। অবশ্য শরিয়তের দৃষ্টিতে অধম লিখক মেজাজি কাবার মূল্যায়নটি বেশি করতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ মূর্ত না থাকলে বিমূর্তের পরিচয় ধরা যায় না। মানবদেহ আছে বলেই নফ্সের পরিচয়টি বোঝা যায়। মোহরমের মাতম আছে বলেই কারবালার বিষাদময় ঘটনা এবং রসুলের আওলাদদের শহিদ হবার ঘটনা এবং বিশেষ করে শহিদে আজম ইমাম হোসেইন আলাইহেস সালাতুস সালামের ঘটনাটি প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয়। প্রতিবছর মনটিকে বেদনায় ডুবিয়ে দেয়। যদি মোহরমের মাতমের ঘটনাটি না থাকতো তা হলে আওলাদে রসুলদের কারবালায় নির্মম শহিদ হবার ঘটনাগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকতো অথবা ফিল্ম বানিয়ে ছবি দেখানো যেত। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই মেজাজি কাবার মেজাজি হজটিকে খাটো করে দেখার অবকাশ নাই।
অধম লিখক ধরে নিলাম, এই ব্যাখ্যাটি তথা এই কথাগুলো মেজাজি কাবার জন্যই বলা হয়েছে। সেই কথাগুলো কী? হজরত হাসান বসরি বলেছেন : হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহ যে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই নির্দেশটি হলো, কাবা ঘরটিকে দুনিয়ার বস্তু ও আবর্জনা হতে পবিত্র রাখা। সাঈদ ইবনে জরির বলেছেন যে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেন : আন্ তাহেরান বাইতি অর্থাৎ ঘরটিকে পবিত্র রাখো। এই পবিত্র রাখো' কথাটির দ্বারা কোনো কোনো তফসিরকারী মূর্তি হইতে পবিত্র রাখার কথাটি বলেছেন। এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায় : ইহা কি মাটি-পাথরের মূর্তি, না লোভ-মোহের দ্বারা তৈরি বিমূর্ত মূর্তি? যদি কেউ বলেন, ইহা মাটি-পাথরের মূর্তি, তা হলে ঠিক আছে; আবার কেহ যদি বলেন, ইহা লোভ ও মোহের দ্বারা নির্মিত বিমূর্ত মূর্তি, ইহাও ঠিক আছে। এই ‘আন্ তাহেরান বাইতি' যাহা হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ইহার অনেক রকম ব্যাখ্যা দেখতে পাই। অনেকেই বলেছেন : মূর্তি, পাপকর্ম, পাপকথা, মিথ্যা এগুলো থেকে ঘরটিকে পবিত্র রাখতে হবে। আবার অনেকে এই কথাটির উপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা লিখেছেন যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহর স্থান নাই এ রকম ব্যাখ্যাটিও করেছেন। কারণ আল্লাহ্র ঘরে অন্য ইলাহ অবস্থান করলে শেরেক হয়ে যায় তথা অংশীদারিত্বের কথাটি মেনে নেওয়া হয়। অনেকে বলেছেন, আল্লাহ্র ঘরে কোনো মূর্তিরই থাকার স্থান হতে পারে না। সবচেয়ে যে বড় মূর্তিটি উহার নাম লোভ-মোহ তথা লাত্-মানাত । হাকিকি কাবার কথাটি বলতে গেলে কাবাকে মানব দেহ এবং কলবের প্রতীক করা হয়েছে। মানব দেহটি নিরাপত্তাহীন। কারণ নফসের সঙ্গে খান্নাস আছে। খানাস থাকলেই মানব দেহঘরটি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। এই মানব দেহের ভিতরে যে কলুব নামক গোশতের টুকরা আছে উহা তখনই সম্পূর্ণরূপে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে যখন খান্নাসরূপী শয়তানটি অবস্থান করে। যখন মানব দেহের এই কল্ব নামক গোশতের টুকরা হইতে খানাসটিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় তখন সমস্ত মানব দেহ নামক কাবাটি পবিত্র হয়ে যায় আর খান্নাস থাকলে মানব দেহটি অপবিত্র হয়ে যায়। এই খান্নাসরূপী শয়তানই মানব দেহের অভ্যন্তরে কল্ব নামক স্থানে অবস্থান করে লোভ-মোহ নামক অনেক মূর্তির পূজা করায় এবং ঐ মূর্তিপূজা করাটিকেই বলা হয় শেরেক করা। সুতরাং শেরেক ভিতরের বিষয়, বাহিরের
বিষয় নয়। খানাসমুক্ত মানব দেহটির অধিকারীরাই জগতগুরু, জগতপীর, জগত মুরশিদ, জগত সাঁই বাবা। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং হজরত ইসমাইল (আ.) জন্ম হতেই আজন্ম খান্নাসমুক্ত। কারণ তাঁরা নবি, তাঁরা জগত নামক বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। তাই 'তাঁহার মোকাম' তথা ইব্রাহিমের মোকাম তথা তাঁহার মর্যাদার স্তরের দিকে অগ্রসর হবার অনুশীলন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশের মূল বিষয়টি হলো সালাত তথা যোগাযোগ তথা সংযোগ মোকামে ইব্রাহিম কে মুসাল্লারূপে গ্রহণ করো- এরূপ কথাটি না বলে ইব্রাহিমের মোকাম হতে মুসাল্লা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুসাল্লা শব্দটির অর্থ হলো সালাতের অবস্থান
অথবা আসন, যে– আসন বা অবস্থান হতে সালাত নামক যোগাযোগের মাধ্যমে ধ্যানসাধনাটি করতে হয়। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর উচ্চতম মর্যাদার সালাতের যে উচ্চতম স্থান উহাকে মুসাল্লারূপে সহসা কেহই গ্রহণ করে নিতে পারবে না। এ জন্যই 'উহা হইতে আসন' গ্রহণ করবার নির্দেশটি দেওয়া হয়েছে। এখন যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব সেইরূপ মর্যাদা হতেই ততটুকু গ্রহণ করে নিতে পারবে। আরও একটি কথা থেকে যায় আর সেটা হলো, এই পথের পথিক হতে না চাইলে কাউকে খান্নাসমুক্ত করা যায় না। 'তওয়াফকারী' বলতে আদর্শনের খান্নাসমুক্ত অনুশীলনকারী সাধকদেরকেই বোঝানো হয়েছে। তওয়াফ করতে করতে যখন খান্নাসমুক্ত হয়ে পড়েন তখন অনুশীলনকারী দেখতে পান যে তিনি জীবন্ত একটি কাবা।
সেজদায় পৌছুবার জন্য রুকু করার অর্থটি হলো খান্নাসকে কলব হতে মুক্ত করার বিভিন্ন প্রকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। অনেকটা উপমার ছলে বলছি, সৈনিকদের আদর্শ সৈনিক হবার জন্য যে রকম অনেক সহজ ও কঠিন অনুশীলন করে যেতে হয়, সেই রকম রুকু সেজদার মাধ্যমে খান্নাসকে তাড়াবার অনুশীলন করতে হয়। তবেই হাকিকি কাবার পরিচয়টি লাভ করা যায়। এই লাভ নগদ লাভ। এই লাভ বাকিতে নয়। কারণ বাকির নাম ফাঁকি। মেজাজি হাজিদের জন্য বাকিতে পাবার কথাটি খাটে, তবে ইহা ফাকি নয়; কারণ অনুশীলনের মর্যাদা অনুযায়ী দু'য়েকটি কেয়ামত দর্শনের পরই আত্মদর্শনটি হয়।
🌻কোরানের দৃষ্টিতে নামাজ ৮২বার
🔴ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী

Comments
Post a Comment
JOY GURU.
Thank you for your valuable comment.