কোরান-এ সালাতের উল্লেখ ৭
কোরান-এর ২ নম্বর সুরা বাকারার ১৫৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : হে তোমরা যাহারা ইমান আনিয়াছ! আমাদের নিকট সাহায্যপ্রার্থী হও, সবর (ধৈর্য্য) এবং সালাতের সাথে (মাধ্যমে)। (ইয়া আইয়্যুহাল লাজিনা আমানুসতাঈনু বিস সাবরে ওয়াস সালাতে)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের (ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন (ইন্নাল্লাহা মাআস সাবেরিনা)।
ব্যাখ্যাঃ
ছোট্ট তিনটি আয়াত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অত্যন্ত গভীর। গভীরের চেয়েও অনেক বেশি গভীর। প্রথমেই আল্লাহ বলছেন : হে আমানুরা তথা হে ইমানদারেরা, তথা যারা ইমান এনেছে কেবল তাদেরকেই আল্লাহ বলছেন। এখানে মানবজাতিকে উল্লেখ করে বলা হয় নাই, তথা 'ইয়া আইউহান নাস' বলা হয় নাই। এখানে মুসলমানদের উদ্দেশ করে বলা হয় তথা 'ইয়া আইউহাল মুসলেমুন' বলা হয় নি। এখানে মোমিনদের উদ্দেশ করে বলা হয় নি, তথা ‘ইয়া আইউহাল মুমিনুন' বলা হয় নি। এখানে আলবাব এবং আফসারদের উদ্দেশ করে বলা হয় নি, তথা জ্ঞানীলোক এবং চিন্তাশীলদের লক্ষ করে বলা হয় নি, বরং একমাত্র তাদেরকেই বলা হয়েছে যারা ইমান এনেছেন। কী বলা হয়েছে? কী আদেশটি দেওয়া হয়েছে? কী উপদেশটি রাখা হয়েছে? বলা হয়েছে, তোমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। সেটা কী সাহায্য ? সেটা কি বিত্ত-বৈভবের সাহায্য? সেটা কি বিলাসিতায় চমকানো তথাকথিত সভ্যতার আলোকে প্রতিষ্ঠিত হবার সাহায্য? তা হলে এখানে আল্লাহকে আল্লাহরূপে পাচ্ছি না, এখানে আল্লাহকে রবরূপে পাচ্ছি না, এখানে আল্লাহকে রহমান ও রহিমরূপে পাচ্ছি না, বরং আল্লাহকে একটি বিশেষরূপে পাচ্ছি আর সেই রূপটির নাম হলো 'মস্তান।
খান্নাসমুক্ত নফ্সে রুহের উদ্ভাসিত রূপ যার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাঁকেই 'মস্তান' বলা হয়; তাঁকেই আবার 'ওয়াজহুল্লাহ' বলা হয় তথা আল্লাহ্র চেহারা বলা হয়; তাঁকেই আবার 'বান্দানেওয়াজ' বলা হয়, তথা যে বান্দার মধ্যে আল্লাহ্র নেওয়াজ তথা রহমতটি ফুটে উঠেছে। বাংলা ভাষায় বলা হয় নরের রূপে নারায়ণ তথা নরনারায়ণ। অন্যের গাত্রদাহ হবার প্রশ্নে বলছি না, বরং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করে বলছি, যারা খান্নাসমুক্ত নফসের অধিকারী তাঁরাই মস্তান। এক কথায় এঁরাই আল্লাহ্র ওলি।
এই মস্তানি সাহায্য চাইতে বলেছে কোরান। কিন্তু কাদেরকে বলা হয়েছে? যারা ইমান এনেছে তাদেরকে বলা হয়েছে। আর যারা খান্নাসমুক্ত নসের অধিকারী, তাঁরা তো নিঃসন্দেহে মোমিন মোমিনের উপরও খুব কম ছোটখাট কিছু আদেশ-উপদেশ দেবার কথাটি কোরান-এ পাই। আমরা পরে মোমিনদের উপর যে ছোটখাট আদেশ-উপদেশগুলো দেওয়া হয়েছে সেইগুলো কোরান হতে তুলে ধরবো এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবো। তবে অল্প কথায় বলছি, মোমিনদেরকে যে আদেশ-উপদেশগুলো দেওয়া হয়েছে সেই উপদেশগুলো ছোটখাট উপদেশ। দুঃখ হয় যখন অনুবাদক 'আমানু'-কে 'মোমিন' বলে অনুবাদ করেন। এই 'আমানু'-কে 'মোমিন' বলে অনুবাদ যারা করে তাদের এই অনুবাদের শ্রী দেখে ইঞ্জিল এবং তাওরাত-এর অনুবাদগুলোর বিকৃত, বানোয়াট এবং মনগড়া অনুবাদগুলো ধর্মের আসল বিষয়গুলোকে কতখানি চাপা দিয়ে ফেলেছে তা বোঝা যায়। আমাদের বড়ই সৌভাগ্য যে কোরান-এর অনুবাদ পাই নি, বরং আল্লাহ্র নাজেলকৃত আরবি ভাষার কোরান-টিকে হুবহু পেয়েছি।
এই মস্তানি সাহায্যটি ইমানদারদেরকে চাইতে বলছেন আল্লাহ তাঁর কোরানুল করিম-এ। সাহায্য চাইতে বলা হয়েছে খান্নাসমুক্ত নসের অধিকারী হবার জন্য। কোরান বলছে, সবর এবং সালাতের মাধ্যমে সাহায্যটি চাইতে হবে। সবর অর্থ ধৈর্য আর সালাত অর্থ নামাজ তথা যোগাযোগ তথা আল্লাহ্র সঙ্গে সংযোগ প্রচেষ্টা।
প্রথমে সবর তারপর সালাতের কথাটি বলা হয়েছে। কিন্তু এই কথাটি বলা হয় নি যে, প্রথমে সালাত তারপরে সবর। এখানে ওয়াক্তিয়া সালাতের চেয়ে দায়েমি সালাতের কথাটির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই প্রথমে সবর তথা ধৈর্যধারণের কথাটি বলা হয়েছে। ওয়াক্তিয়া সালাতের মধ্য দিয়ে দায়েমি সালাতের দিকে অগ্রসর হতে হলে বিরাট ধৈর্যের প্রয়োজন তথা সবরের প্রয়োজন। কিন্তু শেষের আয়াতটি পড়ে চমকে যেতে হয়, অবাক হতে হয়, বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়, যখন দেখতে পাই আল্লাহ বলছেন, 'ইন্নাল্লাহা মা আস সাবেরিন' তথা 'নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে আছেন' তথা যারা ধৈর্যধারণ করতে পারে তাদের সঙ্গেই আল্লাহ আছেন বলে ঘোষণাটি দেওয়া হয়েছে। মস্তানি সাহায্য চাইতে ইমানদারদেরকে বলা হয়েছে : সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও তথা ধৈর্য ও নামাজের মধ্য দিয়ে সাহায্যটি চাও। সাহায্যটি চাইবার প্রশ্নে এখানে আমরা দুটি শব্দ দেখতে পাই : একটি 'সবর', আরেকটি 'সালাত'। কিন্তু পরিশেষে আল্লাহ এই কথাটি বললেন না যে, ইন্নাল্লাহা মা আস সাবেরিন ওয়া মাল মুসাল্লিন অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে এবং নামাজিদের সঙ্গে আছেন তথা ওয়ামাল মুসাল্লিন শব্দটি তথা নামাজিদের সঙ্গে আছি, কথাটি বলা হয় নি। এবং পাঠকেরা অবাক হবেন এই কথাটি শুনে যে, সমগ্র কোরানুল মজিদ এর একটি আয়াতেও বলা হয় নি যে, আল্লাহ নামাজিদের সঙ্গে আছেন। কেন বলা হয় নি? লোক দেখানো নামাজ এবং আল্লাহ্র সঙ্গে যোগাযোগের নামাজের মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। লোক দেখানো নামাজের জন্য পুরস্কার পাবার তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং ওয়াইল নামক দোজখে ফেলে দেবার কথাটিও জানতে পারি। আওলাদে রসুল, শহিদে আজম এবং ‘আমা হতে হুসাইন এবং আমি হুসাইন হতে' তথা 'হুসাইনু মিনি ওয়া আনা মিনাল হুসাইন-সেই আওলাদে রসুল ইমাম হুসাইনের তাঁবুতে কারবালার রণপ্রান্তরে নামাজ আদায় করার আজানের সুমধুর আহ্বানটি জানানো হচ্ছে আবার নরপিশাচ এজিদের ধাবমান মনুষ্যরূপী কুত্তাদের তাঁবুতেও আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আওলাদে রসুল ইমাম হুসাইনের তাঁবুতে মহানবির জলিল কদরের সাহাবারা নামাজ-রুকু-সেজদা দিচ্ছেন : আবার নরপিশাচ এজিদের ধাবমান মনুষ্যরূপী কুকুরেরা, যারা এজিদের কাছে ইসলামের আদর্শ ফেলে দিয়ে বিবেকের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিয়েছে, তারাও নামাজ পড়ছে। মানুষের সর্বশেষ সম্বলটি হলো তার বিবেক। এই শেষ সম্বল বিবেকটুকু যারা বিক্রি করে দেয় তারা তো পশুর চেয়েও খারাপ। পশুরাও এদেরকে ঘৃণা করে। দুই দিকেই আজান, দুই দিকেই রুকু-সেজদা-নামাজ। তাই আল্লাহ কোরান-এর একটি আয়াতেও বলেন নি, 'আমি নামাজিদের সঙ্গে আছি।' তাই ‘ওয়া মাল মুসাল্লিন' তথা 'এবং নামাজিদের সঙ্গেও আছি এই কথাটি না বলে বলা হয়েছে 'ইন্নাল্লাহা মা আস সাবেরিন' তথা 'নিশ্চয়ই আমি ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছি।'
আল্লাহর ওলিরা বছরের পর বছর ধরে ধ্যানসাধনা তথা মোরাকাবা-মোশাহেদার মাধ্যমে খান্নাসমুক্ত নসের অধিকারী মোমিন হবার জন্য ধৈর্যধারণ করে থাকেন। সুতরাং ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই আল্লাহ আছেন বা থাকেন কথাটি বলা হয়েছে।
🔴কোরানের দৃষ্টিতে নামাজ ৮২ বার
⏹️ ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী

Comments
Post a Comment
JOY GURU.
Thank you for your valuable comment.