পুঁজিবাদ ও ইসলামের প্রভেদ
অতএব আমরা দেখতে পাই ‘বস্তুবাদ’-এর ইসলামি ব্যবস্থাপনাকে জগতের বুকে প্রত্যক্ষ সামাজিক আদর্শরূপে কোন কালেই প্রতিষ্ঠা করা হয় নি। যদিও কোরান-হাদিস পথের সন্ধান দিয়ে দিয়েছে, তবু লিখিত আদর্শে লোকে বিশ্বাসী নয়।আর সেই যুগে লিখিত কথার মাধ্যমে প্রচার করা একপ্রকার ছিল না বললেই চলে। আরবের অল্প সংখ্যক লোক দিয়ে বিরাট সাম্রাজ্যের ব্যবস্থাপনা সে যুগে প্রথম অবস্থায় সহজসাধ্য ছিল না। কাজেই তাদের শাসিত বিরাট ভূখ-ে সেই আদর্শবাদ সম্পূর্ণ করে রেখে যেতে পারেন নি। লিখিত আদর্শ হিসাবে ইসলামের বস্তুনিয়ন্ত্রণবাদ পূর্ণতাপ্রাপ্ত থাকা সত্ত্বেও উহারপ্রয়োগপদ্ধতির পূর্ণ প্রকাশ তখনো সমাজে প্রতিষ্ঠা করবার সুযোগ ও সময় পান নি। অন্ধ, বর্বর এবং পাপে-ভরা ছন্নছাড়া যুগের এত শত বছরের সমাজ জীবনের ধারা এত ক্ষুদ্র সময়ের ভেতর সম্পূর্ণরূপে বদলিয়ে ফেলা সহজসাধ্য নয় এবং তা কোনো কালেই সম্ভবপর নয়। তাই যে আদর্শের প্রতিষ্ঠা রসুলাল্লাহ (আ.) রেখে গেলেন উহা চার খলিফার রাজত্বকাল পর্যন্ত অগ্রসর হতেছিল, কিন্তু সেই অগ্রসরের গতি মোনাফেক এজিদ রাজতন্ত্রের সাগরে ডুবিয়ে দিল। আর কখনো তার প্রতিষ্ঠার
চেষ্টাও করা হয় নি। ফলে নামমাত্র ইসলাম শরিয়তের মুখোশে আবদ্ধ হয়ে রইলো। কেউ হয়তো এজিদকে মোনাফেক এজিদ বলাতে নিতান্ত ভাবাবেগের পরিচয় দেবার কথা বলবেন। কিন্তু ইহা
ভাবাবেগ নয়, কোরান-হাদিসের মানদ-ে এজিদের যে বিশ্্রী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইতিহাসে ফুটে উঠেছে তারই সত্যিকার রূপ।পুঁজিবাদ এবং বস্তু-মোহ ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য মনোবৃত্তি। পুঁজিপতির জন্য বেহেস্ত শুধু হারামই করা হয় নি, তা ছাড়া পুঁজিবাদের নীতি ইসলামে যেন কোনো ক্রমেই আসন নিতে না পারে তার জন্য রসুলাল্লাহ (আ.) আমাদেরকে ভীষণভাবে সাবধান করে দিয়েছেন। ধনের প্রতি লোভ এবং কর্তৃত্বের বিশ্রী বাসনা মানুষের মনে ও চিন্তাধারায় এমনভাবে প্রতারণা এবং মানবতাবিরোধী মনোভাব তৈরি করে, যে রকম শুকনো দুর্বাদলের উপর পানি দিলে সজীব হয়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। তাই রসুলাল্লাহ (আ.) আমাদেরকে সাবধান করে দিয়ে বললেন, ‘ধনাসক্তি ও প্রভুত্বের মোহ মনের মধ্যেএমনভাবে মোনাফেকি উৎপন্ন করে, যেমন পানি ঘাস উৎপন্ন করে থাকে।’
ধনের অহংকার এবং মান-মর্যাদার মোহ মানুষের ধর্মভাবকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। অনেক দিনের ভুখা বাঘের
সামনে একটি বকরিকে ফেলে দিলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তার চেয়েও অনেক বেশি মারাত্মকভাবে মানুষের ধর্মভাবকে ধ্বংস
করে দেয় এই অহংকার আর মোহ। তাই পুনরায় রসুলাল্লাহ (আ.) সাবধান করে দিয়ে বললেন, ‘ধনৈশ্বর্য ও মান-মর্যাদার
মোহ মানবহৃদয়ে প্রবেশ করে তার ধর্মভাবকে যেরূপ সাংঘাতিকরূপে বিনষ্ট করে দেয়, বকরির পালের মধ্যে দুটো ক্ষুধার্ত
বাঘ প্রবেশ করেও ততদূর সাংঘাতিক ক্ষতি করতে পারে না।’
ধনবান লোকেরাই ধনের উগ্র নেশায় মানুষের সহজাত দাবি প্রীতি এবং সাম্যবাদ কাঁচ ভাঙার মতো চুরমার করে দেয়।
মানুষের প্রতি মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ ধনের নেশায় ধনী লোকদের মন হতে ব্রাশ দিয়ে মুছে ফেলে দেয়। তাই বিশ্বমানবসমাজে
এই ধনী লোকেরাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট বলে ইসলাম ঘোষণা করছে। রসুলাল্লাহ (আ.) এই কথাটুকু বোঝাবার তরে কত রকম
উপমা দিয়েই না আমাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। যেন ধনের মোহে ধনী লোক হয়ে সাম্যবাদের আদর্শকে তথা
ইমানের প্রথম শর্তের সীমানা হতে সরে না পড়ি। একদিন উপস্থিত সাহাবিরা রসুলাল্লাহ (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া
রসুলাল্লাহ! কোন ব্যক্তি আপনার উম্মতিদের মধ্যে সবচাইতে নিকৃষ্ট?’ তিনি বললেন, ‘ধনবান লোকেরাই সবচাইতে নিকৃষ্ট।’
পুঁজিবাদের হীন স্বার্থ মানুষের সমাজ হতে জঘন্য পাশবিক উপায়ে উদ্ধার করে ধনী লোকেরা নিজেদের আপ সে আপ
মনে করে। কিন্তু এই সমস্ত ধনী লোকেরা বুঝতে পারে না যে সমাজের সহজ-সরল মানুষেরা কোনো দিন তাদের অন্তর হতে
ক্ষমা করবে না। একদিন তারা ধনীদের হীন প্রচেষ্টাকে চিরতরে বিশ্বসমাজ হতে উপড়িয়ে ফেলবেই। ধনী লোকেরা তথা
পুঁজিবাদের সমর্থকদের দল যত অহঙ্কার আর আস্ফালনই মানবসমাজের বুকে করুক না কেন, কিন্তু অবহেলিত মানবসমাজ
সহজেই বুঝতে পারে যে তারা সবাই কাগজের বাঘ। এই সমস্ত কাগজের বাঘদের মানবসমাজ কোনোদিন ক্ষমা করতে
পারে না। কত বড় জঘন্য মনোবৃত্তিসম্পন্ন হতে পারলে এই সমস্ত পুঁজিপতিরা রসুলাল্লাহ (আ.)-এর মহান আদর্শের উপর
পুঁজিবাদের কিছুটা সমর্থন আছে বলে প্রচার চালায়! কত বড় বেইমান হতে পারলে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রসুলাল্লাহ (আ.)-
এর উপর পুঁজিবাদের সমর্থনের বোঝা চাপিয়ে দেয়! অথচ ইসলাম ধনদাসদের জানাজা পড়া হারাম করে দিয়েছে। শুধু কি
জানাজা পড়তে বারণ করেছে ইসলাম? ধনদাসদের পীড়াকালে সেবাটুকু পর্যন্ত করতে কঠোরভাবে মানা করা হয়েছে।
ধনদাসেরা রোগশয্যায় ছটফট করছে - করতে দাও - তারা জানোয়ারের চেয়ে অধম - তাদের জন্য অবহেলিত মানুষ
করবে সেবা! অসম্ভব - ইসলাম বজ্রকঠিন কণ্ঠে ঘোষণা করছে। ইসলাম বলেছে, সাবধান, অবহেলিত বিশ্বমানবের
সন্তানেরা যেন ধনদাসদের সালাম না করে, সম্মান না দেখায়, ইসলাম ঘোষণা করছে, হে বিশ্বের অবহেলিত জনতা -
তোমাদের সন্তানরা যেন ধনদাসদের সামান্য সহানুভূতি প্রদর্শন না করে। যদি ধনদাসদের সহানুভূতি ও সম্মান তোমাদের
সন্তানদের প্রদর্শন করার প্রশ্রয় দান কর তবে মনে রেখ, তাদেরকেও ইসলামকে বিনাশ করার কাজে ধনদাসদের সাহায্যকারী
ও সহায়করূপে ধরা হবে। কারণ, এই শ্রেণীর ধনদাসেরা ইসলামকে বিনাশ করার কাজে লিপ্ত থাকে।
(চলবে......)

Comments
Post a Comment
JOY GURU.
Thank you for your valuable comment.