পুঁজিবাদ ও ইসলামের প্রভেদ-২
রসুলাল্লাহ (আ.) এই শ্রেণীর পুঁজিবাদীদের সম্বন্ধে বলেছেন, ‘আমার পরে মুসলমানদের মধ্যে এমন একদল লোক
উৎপন্ন হবে যে, তারা নানাবিধ খাদ্য আহার করবে, নানা বিচিত্র কারুকার্যপূর্ণ বহুমূল্যবান পরিচ্ছদ পরিধান করবে,মনোমোহিনী সুন্দরী মেয়েলোক রাখবে, মুল্যবান ঘোড়া গৃহদ্বারে বাঁধবে। অল্পাহারে তাদের ভোজনপ্রবৃত্তি পরিতৃপ্ত হবে না।
অনেক পেলেও তাদের আকক্সক্ষার নিবৃত্তি হবে না। তাদের সমস্ত শক্তি কেবল সংসার-অর্জনেই ব্যয়িত হবে। দুনিয়াকেই
তারা প্রভু বলে মনে করবে। যা কিছু করবে দুনিয়া হাসিলের জন্যই করবে। আমি যে (মোহাম্মদ) (আ.), তোমাদের প্রতি
আমার আদেশ, তোমাদের সন্তানেরা তাদের যেন সালাম না করে। তাদের পীড়াকালে যেন তাদের সেবা না করে। তাদের
জানাজার অনুগমন যেন না করে। এই শ্রেণীর ধনী লোকেরা ইসলামকে বিনাশ করবে। তোমাদের সন্তানগণ যদি তাদের
প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ও সহানুভূতি প্রদর্শন করে তবে তারাও ইসলামকে বিনাশ করার কাজে তাদেরকে সাহায্যকারী ও
সহায়ক হবে।’ (হাদিস এবং কিমিয়ায়ে সাআদাত তৃতীয় খ-)। আল্লাহ বলেন, ‘যে সকল লোক সোনা-রূপা জমা করে অথচ
আল্লাহ্র পথে খরচ করে না, (হে মোহাম্মদ), তুমি তাদের ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও। কেয়ামতের দিন এই
সোনা-রূপা দোজখের আগুনে গরম করে তার দ্বারা তাদের কপালে, পাঁজরে এবং পিঠে দাগ দেওয়া হবে। ইহাই তোমাদের
সঞ্চিত সোনা-রূপা, যা আমার রাস্তায় খরচ না করে তোমরা নিজের জন্য জমা করেছিলে। আজ ইহার আস্বাদ গ্রহণ কর।’
আল্লাহ্র পথে খরচ করার অর্থ কী? মানুষের প্রকৃত সেবার তরে মানুষের সুখ-সুবিধার প্রতি মানুষের সমান বাস্তব
দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করা কি ন্যায়-বিচার এবং আল্লাহ্র পথে খরচ করাই বোঝানো হয় নি? রসুলাল্লাহ (আ.) বলেছেন, ‘অন্যের
জন্য তাহাই পছন্দ কর, যা নিজের জন্য পছন্দ কর। তা হলে তুমি সবচেয়ে ন্যায়বিচারক হতে পারবে।’ রসুলাল্লাহ (আ.)
বলেছেন, ‘সর্বোৎকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যে পরের উপকার করে, সুতরাং তুমি পরের উপকার করে সবচেয়ে ভালো মানুূষ হয়ে
ওঠ।’ পরের উপকার করে দ্রুত সমবণ্টনে সাম্যবাদ পৃথিবীর বুকে যেদিন প্রতিফলিত হবে, সেদিন গণসমাজ সবচেয়ে
ভালো মানুষ হবার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবে নিজেদের মুখম-লে। রসুলাল্লাহ (আ.) বলেছেন, ‘কারো প্রতি জুলুম করো না,
তা হলে নুর বেষ্টিত অবস্থায় পুনর্জীবিত হবে।’
পুঁজিপতিদের পরিণাম যে শুধু ধ্বংসের বীভৎস বিভীষিকায়, তারই কথা বলতে গিয়ে রসুলাল্লাহ (আ.) বলেছেন,
‘তোমরা কি সেই জানোয়ারকে দেখ নি, যে বসন্তকালে লতাপাতা ও ঘাস সারাটি দিন পেট পুরে খেয়েছে, এমনকি অরুণের
আভা নিভে যাবার পরও বিরত হয় নি? জানোয়ারটি এত বেশি খেয়েছিল যে ফলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সে রকম সম্পদও
লোভনীয় বস্তু। হয়তো তোমরাও প্রচুর সম্পদের লোভে পড়ে নিজেদের ‘দ্বীন’ সম্পর্কে অলস হয়ে পড়বে এবং ধন-সম্পদের
মোহে এরূপ লিপ্ত হয়ে পড়বে যে পরিণামে তোমরাও (জানোয়ারের মতো) ধ্বংস হয়ে যাবে।’
রসুলাল্লাহ (আ.) বলেছেন, ‘দুনিয়া তারই বাড়িঘর যার আর কোনোই বাড়িঘর নেই। এবং উহা তারই সম্পদ যার আর
কোনো সম্পদ নেই। দুনিয়ার সম্পদ জমা করে একমাত্র সে-ই যে মুর্খ এবং বুদ্ধিহীন, সেই সম্পত্তির বিরাট বিরাট অংশ
নিজেদের কর্তৃত্বে রেখে ভোগবিলাসে ডুবে থেকে মুসলমান বলে শুধু দাবি নয়, দাতা ও দানবীর সেজে আছে। তবে কি এরা
ইসলামের মানদ-ে মুসলমান? তাদের ভোগ-বিলাসের রক্তিম আঁখির ঝিমিয়ে-পড়া উদ্ধত কথার পাশে পাশে লাখো কোটি
মিসকিন, ফকির আর বেকার যে ক্ষুধার জ্বালায় নিজেদেরকে ভিখারি, লম্পট এবং চোর ও ডাকাতে পরিণত করতে বাধ্য
করছে। তার জন্য দায়ী কে? ইসলাম, না এই ভ-ের দল? তবে কি এদের নির্মূল করা মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য নয়? তবে
কি এদের শাস্তি দেবার জন্য ইসলামের সত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে প্রকাশ্য প্রতিবাদ করার কথা ইসলামের বিধানে নেই? এই
জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কি জেহাদ নয়?
রসুলাল্লাহ (আ.) বলেছেন, ‘যে কেউ উম্মতের মধ্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করবে তখন তাকে যেখানে পাও তরবারির
আঘাত হানো।’ রসুলাল্লাহ (আ.) বলেছেন যে, ‘জুলুমকারীর জুলুম বন্ধ কর।’ রাসুলল্লাহ (আ.) বলেছেন, ‘কসম আল্লাহ্র,
তোমরা কখনো নাজাত পাবে না, যে পর্যন্ত তোমরা জালেমকে জুলুম থেকে বিরত না রাখ।’ রসুলাল্লাহ (আ.) বলেছেন,
‘যদি কোনো জাতি বা দলের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় এবং সেই জাতি বা দল থাকা সত্ত্বেও
তাকে বাধা প্রদান না করে, তবে মৃত্যুর আগে দুনিয়াতেই তাদের উপর আল্লাহ্র আজাব আসবে।’
যারা ইসলামের এই সত্যকে বুঝেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলো তবে কি তারা আল্লাহ্র দেওয়া সত্য প্রকাশ্যে
প্রচার করার আদেশ হতে বিরত রইলো? যারা সত্য প্রচার হতে বিরত রইলো তাদের ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা কি সালাত পালন
করার কথা বিরাশি বারের আদেশ হতে বেশি বলে নি?
যে শাসনব্যবস্থার ভেতরে গোপনে লুকিয়ে থাকে অন্যায়, অবিচার, অসাম্য আর এই শাসনব্যবস্থার যে মুষ্টিমেয় অসাধু
ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয় তাদের এবং তাদের শাসনব্যবস্থা দেশ হতে চিরতরে মুছে ফেলার সম্পূর্ণ দায়িত্ব জনগণের।
যে শাসনব্যবস্থা জনগণকে পাঁকে ফেলে চোর, ডাকাত আর প্রতারকে পরিণত হতে বাধ্য করে সেই শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে
জনগণের বিদ্রোহ করার অপর নামই জেহাদ। যে শাসনব্যবস্থা জনগণের মধ্যে গুটি কতককে বিলাসিতায় ডুবিয়ে রাখে আর
কতককে ভিক্ষাভা- হাতে দোরে দোরে ভিক্ষা করায়, সেই শাসনব্যবস্থা কখনোই ইসলামি শাসনব্যবস্থা নয়। যে
শাসনব্যবস্থায় ধনীর হাতে দেশের পার্থিব সম্পদের চাবিকাঠি দেওয়া হয় আর কোটি জনগণের ভাগ্যে কানা কড়ি দিয়ে
‘আল্লাহ আল্লাহ কর গিয়ে’ নির্দেশ দেয় উহা ইসলামি শাসনব্যবস্থা নয়। উহার বিরুদ্ধে জনগণের প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা
করে ইসলামের সাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এর জন্য মৃত্যুবরণকে বলে জেহাদ। এই প্রকাশ্য সত্য জনগণ বুঝেও যদি
নীরব দর্শকের মতো হাঁ করে থাকে তবে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ্র অভিশাপ।
মানবতার মরা সম্বলটুকু ছিনিয়ে মানুষের ম্লান হাতে যে রাষ্ট্রনায়ক তুলে দেয় ভবিতব্যের ভিক্ষাভা- সে তো নায়করূপী
নিহন্তা নারকী - তাকে সমুচিত শিক্ষা দাও হে মরদে মুজাহিদ। ইসলাম-শিশুকে যারা আমানতের অঙ্গীকারে দু হাতে কোলে
তুলে পুঁজিবাদীদের অগ্নিকু-ে ফেলে দিয়ে অসহায় আর্তনাদ শোনে তারা মোনাফেক - তারা জননীর মুখোশে নরপিশাচ -
ধন-দাসদের ধাবমান কুকুর - তাদের সমাধির উপর ইসলাম-শিশুর গণকুটির রচনা কর, হে মুজাহিদ। এটা জিহাদে সগির।

Comments
Post a Comment
JOY GURU.
Thank you for your valuable comment.