![]() |
| তকদির | বাবা জাহাঙ্গীর |
তকদির সম্পর্কে আলোচনাঃ
পর্ব-০১
প্রবৃত্তির আপন অস্তিত্বে অগণিত চোখ আর জিহ্বা আছে। অভিজ্ঞতার স্তরে স্তরে আঘাতে আঘাতে অস্তিত্ব বিচূর্ণ হতে থাকে যত বেশি, তত বেশি চোখ আর জিহ্বা পরিণত হয় ধারালোয়, খুরের মত ধারালো। অভিজ্ঞতার জ্ঞান এইভাবেই সাধারণত অর্জিত হয়। আপন অস্তিত্বের অভিজ্ঞতার সাজানো ব্যাখ্যা দিয়ে যেতে পেরেছেন যারা, তাঁরাই সমাজে চিন্তাশীল বলে পরিচিত। অস্তিত্বের অভিজ্ঞতার অভ্যন্তরে সূক্ষ্মভাবে লুকিয়ে থাকে অহঙ্কার, না হয় আস্ফালন, না হয় সবজান্তার ভূমিকা পালন করা, অথবা আরো কিছু যা আমার জানা নেই। মনের অজান্তে মনের ভেতর আপসে তৈরি হয়ে যায় একটি অভিজ্ঞতার বৃত্ত। বুঝবার উপায়ই নেই যে, কখন তৈরি হয়ে আছে। জ্ঞানের বিভিন্নতার এবং মতবিরোধের কারখানাটার নামই এই বৃত্ত। অভিজ্ঞতার সত্য বদলায় সময়, যুগ এবং পরিবেশের দিকে চেয়ে। কিন্তু আর একটু গভীরে যদি আপন অস্তিত্বকে গলা ধরে টেনে নিয়ে আসা হয়, তখন অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যাগুলো বোবা হয়ে যায়। আর বলতে চায় না কোন কথা, কোন মন্তব্য। মুর্খরা অস্তিত্ব সহজে অত গভীরে যেতে চায় না। তাই নিজের অভিজ্ঞতার দর্শনে নিজেই হয়ে পড়ে অবিশ্বাসী। এবং ফ্রাসট্রেশন তথা নৈরাশ্যের হা-হুতাশের দহন এই সিঁড়িতেই যারা দাঁড়িয়ে আছেন তাদের।
কনট্রাডিক্শন তথা আত্মবিরোধই ফ্রাস্ট্রেশনের জন্মদাতা। এই কনট্রাডিকশন আপনা হতে আসে না, অভিজ্ঞতার অস্তিত্বে নিজেই বানিয়ে নেয় নিজের মনের অজান্তে। অথচ অবাক হবেন আপনি একটি কথা শুনে আর সেটি হল : আপন অভিজ্ঞতার অস্তিত্বের ভুল এবং বড় বড় ভ্রান্তিগুলো কখনোই স্বীকার করে নেওয়া তো দূরের কথা বরং জোর করে নিজেকে নির্ভুল বলে ঘোষণা করতে চায় এবং চিৎকার করে ঘোষণা করে বেড়ায়। অথচ অবাক হবেন এই কথা শুনে যে, সে একান্ত গোপনে সংশয়ের রোগের যাতনায় ভুগছে অথচ স্বীকার করতে চায় না এবং এটাই হল ইগো, আমিত্ব, খুদি অথবা অহঙ্কার ইত্যাদি। ইহাই আরো গভীরে গিয়ে জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এবং ইহাই গভীর এবং গহীনে প্রবেশের উপকরণের ওপর অহঙ্কারের আগুন ধরিয়ে দেয় এবং উপকরণগুলো পুড়িয়ে ফেলে, যেমন আগুন পুড়িয়ে ফেলে একটি সুন্দর কাঠের তৈরী ফার্নিচারকে। ইহা তকদিরের সমষ্টিগত প্রতিফলন কিনা জানি না। ইহা অভিনয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখস্থ করা সুনির্দিষ্ট চরিত্রের প্রতিফলনের অভিনয়ের বিচিত্র বিকাশ কিনা জানি না। অভিনয়ের যে চরিত্রটি করতে হয় সেটা কি সেই অভিনেতার কিছুক্ষণের তকদিরের প্রকাশভঙ্গি নয়? পছন্দের বাইরে, মনের বিরুদ্ধে যে অভিনয়টি করতে হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সেই অভিনয়ের চরিত্রটিকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করছে, কিন্তু কোন উপায় নেই; কারণ এই মহানাটকের মহাপরিচালক সেই ঘৃণিত চরিত্রের অভিনয়টি একটি মহৎ মানুষকে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। এটা তার তকদিরের লিখন ছিল কিনা জানি না। তকদির একটি সাংঘাতিক জটিল বিষয়; মারাত্মক রহস্যের আবরণের ঘোমটায় লুকিয়ে থাকে এই তকদির। ইহার কি পরিবর্তন করা যায়? এই রহস্যের ঘোমটা কি আপন হাতে জ্বালিয়ে দিয়ে প্রকৃত রূপটি দেখাবার শক্তি অর্জন করা যায়? তকদির আপাতস্থায়ী বলে মনে হলেও উহা অনেক সময় স্থায়ীরূপে প্রতিভাত হয় না। এ জন্যই কোরান অনেকবার ঘোষণা করেছে, 'যাকে ইচ্ছা আমরা রহমত দান করি।' যুক্তিতর্ক আর আইনের দৃষ্টিতে কেমন যেন ধোঁয়াটে মনে হয়, আসলে ইহা কাচের মত স্বচ্ছ বলে প্রমাণিত হয়েছে হাজারো উদাহরণের মাধ্যমে। সীমার দেয়াল থাকা সত্ত্বেও সীমার দেয়াল ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। এটারও কি ব্যাখ্যা দিতে হবে? লালন ফকির নিরক্ষর ছিলেন। শিষ্যরা লিখে রাখতেন তাঁর কথার সাজানো গভীর রহস্য। নিরক্ষর লালন ফকিরের পক্ষে এত বড় অবদান রাখার যুক্তিতর্ক আইনের ধারাগুলো কি মূল্যহীন হয়ে পড়ছে না? নিরক্ষর লালন ফকির কি বাইরে হতে কিছু অর্জন করেছিলেন? আপন সত্তার অস্তিত্বের ভেতর অদৃশ্য প্রচণ্ড ঝাঁকুনির মাধ্যমে অনেক গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছিলেন, যে গভীরতার গহীনে সবার পক্ষে প্রবেশ সম্ভবপর নয় বলে লালন ফকির আমাদের কাছে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এবং ইহাই লালন ফকিরের তকদির। এই তকদিরকেই কোরান বলছে, ‘ইউতিহি মাইয়াসাউ' অর্থাৎ যাকে ইচ্ছে দান করি। অভিনয়ের শিল্পীদের চরিত্র বণ্টনের মালিক যেমন ঝানু পরিচালক এবং মাথা নত করাটাই শিল্পীদের তকদির। তাহলে কাকে গালি দেবো? কার সমালোচনা করবো? কাকে দেব ঘৃণার অভিশাপ? মীর জাফরের অভিনয় করতে গিয়ে বিদ্যাসাগরের ছুড়ে মারা জুতো কি পুরস্কার নয়? আসলেই কি সেই অভিনেতা মীর জাফর? তাহলে কি ছুঁড়ে মারা জুতো বুকে জড়িয়ে অভিনেতা সার্থক অভিনয়ের সার্থকতা প্রচার করতো? এই জুতো উপহার পাওয়াটা সেই অভিনেতার তকদির। কারণ, পরিচালকের আদেশেই মীর জাফরের অভিনয় করতে হয়েছিল। স্রষ্টার এই সৃষ্টির মঞ্চে যারা বিভিন্ন কাজে ছুটে চলেছে সেই কাজগুলো কি তাদের তকদির নয়? আবার সেই তকদিরকেও কেটে দিয়ে সম্পূর্ণ অন্য তকদিরে সমাসীন করা হয়েছে, তারও যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। চোর-ডাকাত আর পাপী বলে পরিচিত, রাজা-বাদশা বলে পরিচিত ছিল এ রকম অনেককে দেখা গেছে, তাদের জীবনের মাঝে কে যেন আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছেন? তিনি কে? তাঁর নাম কী? তাঁর শক্তির পরিচয় জানবার জন্যে কোরানে বহুবার বহু রকমে বলা হয়েছে। সেই শক্তির পরিচয় বাইরে হতে জানবার আহ্বান জানালেও খুবই অল্প উপদেশের মাধ্যমে হয়েছে। আসলে সেই শক্তির পরিচয় জানবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আপন অস্তিত্বের ভেতর। তোমার অস্তিত্বের ভেতর তোমাকে খোঁজার আদেশ দেয়া হয়েছে বহুবার এবং বলা হয়েছে, তোমার অস্তিত্বের কোনো একস্থানে লুকিয়ে আছেন তিনি, এবং উহা জাগিয়ে তোলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, এবং বলা হয়েছে তোমাতেই তোমাকে দর্শন করতে, এবং এই দর্শনকেই বলা হয়েছে খোদা-দর্শন তথা মহাশক্তির দর্শন লাভ করা, এবং এই দর্শনের ভাগ্য যাদের হয়েছে তাঁরাই খোদার রহস্য এবং খোদাও তাঁদের রহস্য। এই রহস্যের ভেদ সহজে খোলা হয় না। কারণ তাহলে সব খেলার শেষ হয়ে যায়। হা-হুতাশ, বিরহ-বেদনা, অন্তর্জালা, ছটফট করা, ফুঁপিয়ে কাঁদা, পাগলের মত ছুটে বেড়ানো ইত্যাদি বিভিন্ন চরিত্রের অভিনয়গুলোর আর তেমন কোন মূল্যই থাকে না বলে মনে হয়।
(চলবে.....)
মারেফতের বানী
ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী

Comments
Post a Comment
JOY GURU.
Thank you for your valuable comment.